রাজকুমারির আর্তনাদ মূল: খাজা হাসান নিজামি
Link will be apear in 15 seconds.
Well done! you have successfully gained access to Decrypted Link.
'শব্দতরু ইসলামি বই গ্রুপ রিভিউ প্রতিযোগিতা জানুয়ারি ২০২০'
||রাজকুমারীর আর্তনাদ||
'রাজকুমারীর আর্তনাদ' ১৮৫৭ সাল পরবর্তী সময় নিয়ে সবচে বেশি গ্রন্থ রচনাকারী খ্যাতিমান উর্দূ সাহিত্যিক খাজা হাসান নিজামির জীবনের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। বইটি প্রকাশের পর পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। তার জীবদ্দশাতেই এর ত্রয়োদশ সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
বাবরের প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে বাহাদুরাহ শাহ জাফরের সময়ে। যিনি প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে মসনদের চেয়ারটিতে বসে থাকতেন রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্তের অধিকারী না হয়েও। আদতে তিনি ছিলেন কাব্যপ্রেমী সাতেপাঁচে না জড়ানো একজন মানুষ। ইংরেজদের সেসব আগ্রাসনে ব্যর্থ-দুশ্চিন্তায় তিনি মাথা ঘামাতেন না। তবে ধর্ম ও রাষ্ট্রপ্রেমীদের মনে জমতে থাকা সেই তুষের আগুন দাউদাউ করে জলে উঠে ১৮৫৭ সালে 'আযাদী আন্দোলন' (সিপাহী বিপ্লব) নাম নিয়ে। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্রাট এতে জড়িয়ে পড়েন।
নানা কারণে আন্দোলন ব্যর্থতায় রুপ নেওয়ায় তিনি মৃত্যুদন্ড থেকে বেঁচে গেলেও নির্বাসিত হোন রেঙ্গুনে। রাজকীয় চেয়ার ছেড়ে সুদূর রেঙ্গুনে চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অনটনের তিক্ত স্বাদ মেনে নিতে না পেরে ১৮৬২ সালে এই ধরা থেকে তাকে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু মোগল পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিণতি কি হয়েছিল? শাহজাদা, রাজকণ্যা হয়েও তাদের খুঁজে বেড়াতে হয়েছিল মুখে তুলে নেয়ার মতো দু'মুঠো খাবার। আলিশান প্রাসাদে থেকে বড় হলেও হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়েছিল মাথা গোঁজার ঠাই পেতে। পৃথিবীর বিস্তৃত এই ভূমিও তাদের জন্য হয়ে উঠেছিল সংকীর্ণ। ১৮৫৭ পরবর্তী মোগল পরিবারের সেসব হৃদয়বিদারক করুণ কাহিনী নিয়ে রচিত খাজা হাসান নিজামির বিখ্যাত বই 'বেগমাত কে আঁসু'; যা রাজকুমারীর আর্তনাদ নামে অনূদিত হয়ে আজ আমাদের হাতে।
লেখক খাজা হাসান নিজামির জন্ম সিপাহী বিপ্লবের মাত্র ১৬ বছর ১৮৭৩ সালে। তাই জীবনের নানা বাঁকে, নানান জায়গায় তিনি দেখা পেয়েছেন মোগল পরিবারের অনেকেরই। তাদের খোঁজে ছুটে বেরিয়েছেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। শুনেছেন ১৮৫৭ পরবর্তী তাদের বিড়ম্বনার গল্প তাদের মুখ থেকে কিংবা তাদের মুখ থেকে শুনা শ্রুতাদের কাছ থেকে। ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন ১৮৫৭ পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে রচিত বইপুস্তক। এ বিষয়ে লেখা 'দাস্তাম্বু', 'আসবাবে বাগাওয়াতে হিন্দ', নওবত পাঞ্জে রুযা', বেলা ম্যায় মেলা', 'বাহাদুর শাহ জাফর' ও দ্য লাস্ট মোগল' গ্রন্থ অন্যতম। তবে ১৮৫৭ সাল পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে সবচে বেশি লিখেছেন খাজা হাসান নিজামি। আর 'বেগমাত কে আঁসু' ( রাজকুমারীর আর্তনাদ) বইটি ভারতবর্ষের বেশিরভাগ সাহিত্যিকের মতে তার জীবনের লেখা শ্রেষ্ঠ বই। বইটি প্রথমত ছোট-বড় বেশ কয়েক ধাপে একাধিক নাম পরিবর্তনে প্রকাশিত হলেও সংযোজন বিয়োজনের পর পরিশেষে এই সুরতে, এই নামে এসে স্থিরতা পায়।
১৯২ পৃষ্ঠার এই বইটিতে স্থান পেয়েছে মোট ২৬ টি শিরোনাম। প্রতিটি শিরোনামের অধীনে লেখক তুলে ধরেছেন মোগল পরিবারের নির্মম ভাগ্যকথা। কারো মৃত্যুদন্ড, কারো নির্বাসন। কারো বা আবার তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করা। দাসী বাদীদের খেদমত ছাড়া যাদের একমুহূর্তও চলত না, তাদেরই হতে হয় অন্যের ঘরের চাকরানি। খাট পালঙ্ক ছাড়া যাদের এক মূহুর্তের নিদ্রা ছিল কল্পনাতীত, তাদেরও ঘুমাতে হয় মাটির বিছানায়। যাদের উচ্ছিষ্ট দিয়ে চলে যেত শত মানুষের খাবার, তারাই দু'মুঠো খাবারের আশায় করে বেড়াত ভিক্ষাবৃত্তি।
বইটির পরতে পরতে ফুটে উঠেছে এমন কিছু চিত্র যা পড়লে মন আঁতকে উঠে। দিলে ক্ষত হয়। অন্তর কেঁদে উঠে। শরীর শিউরে ওঠে। যেই মুসলমানদের হওয়ার কথা ছিল সকলের জীবন চলার আদর্শ, শ্রেষ্ঠ জাতি, যারা এত দীর্ঘকাল সুনামের সাথে শাসন করে গেলেন ভারতবর্ষ; তারাই আজ জীবন বাঁচাতে পালানোর পথ খুঁজে পায় না! কারণ তো সেই একটাই--ঈমানী শক্তি দমে যাওয়া। চেতনা হারিয়ে যাওয়া। জাতিসত্তা ভুলে যাওয়া। এর ফলশ্রুতিতে যা হবার কথা ছিল তা-ই হয়েছে। আর যা হয়েছে তার স্পষ্ট চিত্রই ফুটে উঠেছে খাজা হাসান নিজামির এই গ্রন্থে।
নাশাত ইসলামি ঘরনার নতুন এক রুচিশীল প্রকাশনী। যারা ইতিমধ্যেই নিজেদের 'নাশাত' নামের প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছেন চিন্তাশীল ও সচেতন লেখক ও পাঠক মহলে। ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন জাতির কল্যাণে নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়ে। সক্ষম হয়েছেন নিজেদের জাত চিনাতে। তাই তো তরুণ লেখক ও পাঠকবৃন্দ রীতিমতোই ঝুকছেন তাদের দিকে। তারা জাতিকে উপহার দিয়ে চলেছেন একের পর এক সাড়া জাগানো গ্রন্থ। এই গ্রন্থও ব্যতিক্রম নয়। অর্থবহ ও দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ, মজবুত বাধাই আর উন্নত পাতায় সন্তুষ্ট হতে বাধ্য যে-কোনো রুচিশীল পাঠক। গায়ের মূল্য মাত্র ৩৪০ টাকা।
আর প্রিয় ইমরান রাইহান ভাই বাংলাদেশী তরুণ ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে খুবই পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য একটি নাম। যিনি ইতিহাস পড়তে ভালোবাসেন। জানতে ভালবাসেন। জানাতে ভালোবাসেন। ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে নিখাঁদ ইতিহাস অনুসন্ধানে সুখ খুঁজে পান। সহজবোধ্য করে সেগুলোকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। এরই ধরারাবাহিকতায় তিনি হাত দিয়েছেন ভাগ্যবিড়ম্বিত মোগলদের নিয়ে রচিত 'মেগমাত কে আঁসু' গ্রন্থে। ইতোপূর্বে বাংলা ভাষায় এর দুটি অনুবাদ বের হলেও কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ ছিল না। তাই নিজের ভেতরের ইতিহাসপ্রেমী সত্তার অনুপ্রেরণা এবং তার কাছে জাতির বিরাট প্রাপ্যের কিঞ্চিত দান হিসেবে এই সমৃদ্ধ অনুবাদগ্রন্থের কাজ করা। অভিজ্ঞ ইতিহাসপ্রেমীর হাতের ছোঁয়ায় অনুবাদ খুঁজে পেয়েছে তার শ্রেষ্ঠ অস্তিত্ব। যার যাদুতে অনাগ্রহী পাঠকও হয়ে উঠবে ইতিহাসপাঠে আগ্রহী। খুঁজে পাবে এতদিনের অজানা শূণ্যতা পূরণের উপযুক্ত উপকরণ। প্রাঞ্জল অনুবাদ ও যথাযোগ্য শব্দচয়ন অনূদিত বইটিকে করেছে মৌলিক বইতুল্য।
ইতিহাস নির্ভর মৌলিক কিংবা অনূদিত বইগুলোতে আমরা টান অনুভব করি না। আগ্রহী হই সত্য মিথ্যার মিশ্রণে রচিত উপন্যাসের বইগুলোতে। আর এগুলোকেই নির্ধারণ করি ইতিহাসের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের নিক্তিরুপে। অথচ বাস্তবতা হলো— উপন্যাস কখনো নিখাঁদ ইতিহাস হতে পারে না! তাই মোগল সাম্রাজ্য পতনের পরবর্তী ইতিহাস জানতে চাইলে বইটি হবে আপনার উত্তম উৎস। আপনি বইয়ের সঙ্গ দিলে আপনাকে নিয়ে সে পাড়ি জমাবে সুদূর ১৮৫৭ সালে। ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে ঘুরে আপনাকে দেখাবে তাদের হৃদয়বিদারক জীবনচিত্র। বইয়ের লেখক, অনুবাদক, প্রকাশক ও বইসংশ্লিষ্ট সবাইকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দান করুন!
এক নজরে বই পরিচিতি:
বই: রাজকুমারির আর্তনাদ
মূল: খাজা হাসান নিজামি
অনুবাদ: ইমরান রাইহান
প্রকাশনা: নাশাত
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৯২
গায়ের মূল্য: ৩৪০ টাকা
#ইসলামি_বই_রিভিউ_প্রতিযোগিতা_জানুয়ারি_২০২০






