কুরআনের সাথে হৃদয়ের কথা মূলঃশাইখ ইবরাহীম আস-সাকরান
Link will be apear in 15 seconds.
Well done! you have successfully gained access to Decrypted Link.
বেশকিছুদিন আগের কথা। নিবিষ্ট চিত্তে কুরআন পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে সূরা মাআরিজের ১১ নম্বর আয়াতে পৌঁছি। অমনি চোখের সামনে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক একটি দৃশ্যকল্প ভেসে ওঠে। দৃশ্যকল্পটি ভেসে উঠতেই আমি চমকে উঠি। থমকে দাঁড়াই। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুনিয়ার মায়া-মহব্বত তুচ্ছ মনে হয়। আশা-ভরসার মানুষগুলোকেও স্বার্থপর মনে হয়।
সেই নিদারুণ দৃশ্যকল্পের বর্ণনা দেওয়ার পূর্বে মায়ার বাঁধনে জড়ানো কয়েকটি চিত্র তুলে ধরছি। এতে দুই দৃশ্যের মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবন করা সহজ হবে। সম্পর্কের ক্ষেত্র, পরিধি ও তাৎপর্য সম্পর্কে স্বচ্ছ একটি ধারণা তৈরি হবে এবং বাস্তব জীবনে সেটার প্রতিফলন ঘটাতে পারলে সেই নিদারুণ দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। ইন শা আল্লাহ।
.
আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগের ঘটনা। আমার অত্যন্ত কাছের এক বন্ধু তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলে—
একবার আমি আমার দুই বছরের একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছিলাম। এমন সময় হঠাৎ পা ফসকে পড়ে যাই এবং গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করি যে, মেয়েকে বাঁচানোর জন্য আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার আগে ফ্লোরে পড়ে গেছি। হাত দুটি দ্বারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করার পরিবর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি। মেয়েটি আমার হাত ধরে দিব্যি খেলা করে চলেছে। সে হয়তো টেরই পায়নি, তার এবং আমার ওপর দিয়ে কী ঘটে গেছে। এদিকে আমি ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মারাত্মক রকম আঘাতপ্রাপ্ত হই।
একেই বলে পিতৃত্ব। একেই বলে পিতৃত্বের অনুভূতি। কোনো পিতার মধ্যে এই অনুভূতি জাগ্রত হলে তিনি অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারেন। সন্তানের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারেন। এ জন্য তাকে ভাবতে হয় না; বরং সম্পূর্ণ অবচেতনে ও স্বপ্রণোদিত হয়েই তিনি এমন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে নেন—ঠিক আমার বন্ধুর মতো।
.
আরেক দিনের ঘটনা। আমার এক বন্ধু তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন—
ছেলেবেলায় আমি একবার অসুস্থ হয়ে পড়ি। অর্থনৈতিক দূরবস্থার কারণে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে অসুস্থতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একরাতে আমি অসহ্য রোগ-যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকি। নিরুপায় মা আমার পাশেই শুয়ে ছিলেন। আমার প্রতিটি চিৎকার যেন তার জীর্ণ বুকের ভেতরটা ছেদ করে যাচ্ছিল। তার হৃদয় বিদীর্ণ করে ফেলছিল। তিনি ছলছল চোখে, অসহায়ভাবে এই বলে দুআ করছিলেন, ‘হায়! এই রোগটা তোমার না হয়ে আমার হলে ভালো হতো। কারণ, আমি তোমার মা।’
একেই বলে মাতৃত্ব। মাতৃত্বের প্রবল অনুভূতি। এই অনুভূতি কোনো নারীর মধ্যে জাগ্রত হলে তিনি সন্তানের রোগ-শোকও একান্ত আপনার করে চাইতে পারেন।
একই রকম আরেকটি ঘটনা—
আমার কাছের এক বন্ধু সেদিন মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছে। সঙ্গত কারণেই সে তখন ভীষণ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। বাসায় এসে দেখে, স্ত্রী তার জন্য সুস্বাদু ও উপাদেয় খাবার প্রস্তুত করছে। বন্ধু খাবারের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। খাবার প্রস্তুত হলে প্লেটে সাজিয়ে তার সামনে পরিবেশন করা হয়। এমন সময় ছোট্ট ছেলেটা এসে প্লেটের দিকে ইশারা করে। বাচ্চাটি যে খুব ক্ষুধার্ত ছিল, তা কিন্তু নয়। এটা শৈশবের স্বাভাবিকতার কারণেই হয়েছে। বন্ধু এটা বুঝতেও পেরেছে; কিন্তু এরপরও ছেলের আকুতিভরা দৃষ্টি মুহূর্তেই বাবার সমস্ত ক্লান্তি ও ক্ষুধা ভুলিয়ে দেয়। সে নিজে না খেয়ে ছেলের মুখে লোকমা তুলে দেয়।
কী অদ্ভুত! কীভাবে একজন মানুষ ছোট্ট একটি শিশুর আকুতির সামনে নিজেকে এভাবে ভুলে যেতে পারে? এটাই কি তবে পিতৃত্বের অনুভূতি!
এবার অনেকদিন আগের একটি ঘটনা শুনুন—
অষ্টম হিজরী সন। কোনো এক যুদ্ধে জয়লাভ করার পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম উন্মুক্ত প্রান্তরে এসে সমবেত হন। হাওয়াযীন গোত্রের বন্দিদেরকে তাদের সামনে উপস্থিত করা হয়। এমন সময় এক নারী দৌঁড়ে আসেন। বন্দিদের মাঝে তার হারিয়ে যাওয়া শিশু-সন্তানকে খুঁজতে থাকেন। জনৈক বন্দির কোলে দুধের শিশু দেখামাত্রই তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দুধ পান করাতে থাকেন। এই দৃশ্য দেখে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমাদের কি মনে হয়, এই নারী তার সন্তানকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারবে?’ সাহাবীরা বলেন, ‘না, আল্লাহর কসম! সে কিছুতেই তার সন্তানকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে পারবে না।’ তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘এই নারী তার সন্তানের প্রতি যতটা অনুগ্রহশীল, আল্লাহ বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও বেশি অনুগ্রহশীল।’
সুবহানাল্লাহ! সন্তানদের প্রতি মা-বাবার মমত্ব ও ভালোবাসা কতটা প্রগাঢ়! এই মমত্ব ও ভালোবাসা শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাক জীবজন্তুও তাদের সন্তানের প্রতি একই রকম মাতৃত্বের টান অনুভব করে!
.
এবার তাহলে এরকমই একটি ঘটনা শুনুন!
সুনানু আবি দাউদে বর্ণিত আছে, ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোথাও যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে একটু আড়ালে যান। এমন সময় আমরা একটি মা-পাখি দেখতে পাই। পাখিটির সঙ্গে দুটি বাচ্চা ছিল। আমরা বাচ্চা দুটি নিয়ে আসি। মা পাখিটাও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে এবং ছটফট করতে থাকে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রয়োজন সেরে এসে পাখিটির এই অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করেন—
مَنْ فَجَعَ هذِهِ بِوَلَدِهَا ؟ رُدُّوا وَلَدَهَا إِلَيْهَا
কে এই পাখিকে তার বাচ্চার ব্যাপারে কষ্ট দিয়েছে? দাও! তার বাচ্চাগুলো ফিরিয়ে দাও।
.
নির্বাক পাখিই যেখানে বাচ্চা হারিয়ে এভাবে ডানা ঝাপটায় এবং ছটফট করে সেখানে সন্তানের প্রতি মানুষের মমত্ব ও অনুভূতি কেমন হতে পারে!
'কুরআনের সাথে হৃদয়ের কথা' বই থেকে কিছু অংশ...
...
বই : কুরআনের সাথে হৃদয়ের কথা
মূল : শাইখ ইবরাহীম আস-সাকরান
ভাষান্তর : আব্দুল্লাহ মজুমদার
সম্পাদনা : উস্তায আকরাম হোসাইন
পিকচার : প্রিয় আবু নছর ভাই






