মনের উপর লাগাম লেখকঃ ইবনুল-জাওযী রহ.
Link will be apear in 15 seconds.
Well done! you have successfully gained access to Decrypted Link.
বইঃ মনের উপর লাগাম
লেখকঃ ইবনুল-জাওযী রহ.
অনুবাদঃ মাসুদ শরীফ
প্রকাশনীঃ ওয়াফি পাবলিকেশন
মূল্যঃ ১৭০৳
ইস্যু ফিঃ ৫৳
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂
ইবনুল জাওযীর "আত-তিব্বুর-রূহানী" বইটির বাংলা অনুবাদ "মনের উপর লাগাম" সম্পর্কে লেখক Abdullah Mahmud Nazib এর মতামত।
"হরেক রকম অসুখে ভুগি আমরা। দেহের অসুখ, মনের অসুখ। প্রথমটা দৃশ্যমান, রোগের অস্তিত্ব টের পাওয়া শুরু করলেই কালবিলম্ব না করে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। দ্বিতীয়টা নিজের কাছে সহজে প্রকাশ পায় না, প্রতিবিধান করতে বিলম্ব হয়ে যার হরহামেশাই। তাছাড়া মনের অসুখ এত বেশি বিচিত্র যে, এগুলোর গতি-প্রকৃতি বোঝাও মুশকিল। এই ধরনের অসুখ, অসুখের নেপথ্য তত্ত্ব এবং পথ্য সম্পর্কিত তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কুরআন ও সুন্নাহর পাতায়। ইমাম ইবনুল জাওযী সেগুলোকে একত্রিত করে 'আত-তিব্বুর রূহানী' গ্রন্থের অবতারণা করেছেন। সেই কালজয়ী গ্রন্থের সফল বাঙলায়ণ 'মনের উপর লাগাম'। অগ্রজপ্রতিম কথাশিল্পী জনাব মাসুদ শরীফ অনুবাদক হিসেবে ইতোমধ্যেই লব্ধপ্রতিষ্ঠিত। মূল গ্রন্থ ও অনুবাদের পাণ্ডুলিপি পাশাপাশি রেখে মিলিয়ে দেখার পর মনে হচ্ছিলো, লেখক যদি বাঙলা-ভাষাভাষী হতেন, বোধ করি ঠিক এভাবেই তিনি লিখতেন। এই মন্তব্য যে মোটেও অত্যূক্তি নয়, পাঠক তাঁর পাঠযাত্রার বাঁকে বাঁকে সহসাই উপলব্ধি করতে পারবেন।
.
শুদ্ধাচারী হৃদয়ের সবুজ তৃণভূমিতে জন্মানো আগাছা উপড়ে ফেলার জন্যে এই গ্রন্থ নিড়ানি হয়ে কাজ করবে। বিশ্বাসী অন্তরের ভারী নিঃশ্বাস-কে হালকা করার জন্যে 'মনের উপর লাগাম' হতে পারে একটি আগাম প্রতিষেধক।"
.
লেখকের কথাঃ
"পাঠক, মানুষের জন্য আল্লাহ যা কিছু বরাদ্দ রেখেছেন তার সবই অথবা তাদের মঙ্গলের জন্য। হয় কোনো উপকারের জন্য- যেমন ক্ষুধা-অথবা কোন ক্ষতিরোধের জন্য- যেমন রাগ। কিন্তু ক্ষুধা যদি বেশি বেড়ে যায় তা হলে সেটা অতিভোজনে রূপ নেয়। তখন কিন্তু সেটা ক্ষতিকর। আবার রাগ যদি বেসামাল হয়, মানুষ তখন অশান্তি সৃষ্টি করে। বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য মাথায় রেখে আমি এই বইটি লিখেছি:
-মনকে সঠিক সন্দুরভাবে নিয়ন্ত্রণ
-খায়েশের মুখে লাগাম পরানো
-অসুস্থ ইচ্ছার চিকিৎসা
পরবর্তী ৩০টি অধ্যায়ে এ বিষয়গুলো আমি ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করেছি।"
রোগ-বালাইয়ের শেষ নেই। মাঝে মধ্যে এমন এমন অসুখের নাম শুনি, যার অস্তিত্ব আগে কখনো টেরই পাইনি। অসুখগুলোর যদি তালিকা করা হয়, তা হলে মোটা দাগে দুটো শিরোনামে সবগুলো অসুখ চলে আসবে। দেহের অসুখ আর মনের অসুখ। হরহামেশাই এই দুই শ্রেণির কোনো না কোনো অসুখ আমাদের লেগেই থাকে। দেহের অসুখের অবস্থাটা দৃশ্যমান। প্রাত্যহিক জীবন বাঁধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তাই এর চিকিৎসায় আমরা কাল-বিলম্ব করি না। কিন্তু মনের অসুখগুলো মনের গহীনে থেকে যায়। অবহেলায় উপেক্ষায় একটা সময় সেগুলো কঠিনভাবে বাসা বাঁধে আমাদের হৃদয়ের মাঝারে। দেহের রোগ যখন প্রকট আকার ধারণ করে, মানুষ তখন মরে যায়। আর রূহের রোগ যখন প্রকট আকার ধারণ করে, তখন রূহ তার রবের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। আর রব-হারা রূহের মাঝে কোনো জীবন নেই। সে মৃত। তার আকাশে কোনো আলো নেই। গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। তার জমিনে কোনো উর্বরতা নেই। যাই লাগান, ফলাফল অস্থায়ী।
তাই রূহের চিকিৎসা দেহের চিকিৎসার চেয়েও বেশি জরুরী। এ জন্য কুরআন সুন্নাহ জুড়ে আমরা রূহের চিকিৎসার আলোচনাই বেশি পাই। ৫০০ হিজরি সনের মহান ইমাম ইবনুল-জাওযী রহ. কুরআন সুন্নাহয় ছড়িয়ে থাকা সেই চিকিৎসা পথ্যগুলো একত্র করে রচনা করেছেন 'তিব্বুর রূহানী', যার বাঙলায়ণ 'মনের ওপর লাগাম' বইটি। বইটির পাতায় পাতায় তিনি এঁটে দিয়েছেন রূহের কার্যকরী সব চিকিৎসা-বিধান। প্রতিটি রোগ ধরে ধরে আলোচনা করেছেন একজন আত্মার চিকিৎসকের ন্যায়।
.
**প্রশ্ন হলো, বইটি এত ছোট কেন? রূহের রোগ-বালাই অসংখ্য, বৈচিত্র্যময়; তা হলে এর চিকিৎসা-বিধানও কি বিস্তারিত হওয়া জরুরী ছিল না?**
.
আসলে সালাফ আর খালাফ, তথা পূর্ববর্তী আর পরবর্তীদের মাঝে তফাৎটা এখানেই। পূর্ববর্তীরা কথা বলতে গাছের গোঁড়া নিয়ে। প্রতিটি শব্দ বলতেন গুণে গুণে। আর আমরা বলি ডাল পালা নিয়ে। ফলে আমাদের কথাগুলোও হয় গাছের পাতার মতো গুণে শেষ করা যায় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লেখক গোটা বইতে শুধু প্রধান প্রধান রোগ বালাই নিয়ে কথা বলেছেন। যে রোগগুলোর সূত্র ধরে হাজারো রোগের জন্ম হয়, সেগুলোর গতি-প্রকৃতি এবং পথ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেমন দেখুন,
(১) প্রথম অধ্যায়টি বিবেকের গুণ নিয়ে। আর দ্বিতীয় অধ্যায়টি কামনার সমালোচনা। এ দ্বারা লেখক যেন পাঠকের সামনে বিবেকের আসল অবস্থা এবং কামনার সাথে এর গভীর সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করছেন। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, প্রত্যেক অন্তরেই একটি দরজা, নাম কামনা-বাসনা। কামনার এই দরজা দিয়েই সকল রোগ-বালাইয়ের অনুপ্রবেশ ঘটে।
(২) এরপর তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন প্রেমের ভূত নিয়ে। অধ্যায়টি পড়ে আমার ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ রহ.-এর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তাঁর 'আল-উবূদিয়্যাহ' গ্রন্থে অনেকটা এরকম বলেছিলেন, 'ব্যক্তির সকল নড়াচড়ার মূলে থাকে ভালোবাসা। মানুষ যা ভালোবাসে, যা পছন্দ করে, সে সেই ব্যাপারেই চাহিদা অনুভব করে এবং সে দিকেই ধাবিত হয়।' ইবনুল-জাওযী রহ.-ও একই সুরে কথা বলে গেছেন। আর এজন্যই অন্য যে কোনো অসুখের আগে এনেছেন আগে প্রেমের ভূত তাড়ানোর কথা।
(৩) চতুর্থ অধ্যায়টি 'শারাহ তাড়ানো' নিয়ে। শারাহকে 'অতিভোজন' বলা হলেও বাস্তবিক অর্থের এর রকমারি ধরণ আছে। সম্পদের স্তূপ করা, অপচয়, অত্যধিক দৈহিক মিলন সেগুলোর অন্যতম। মোট কথা শারাহ এর আলোচনা টেনে লেখক আমাদেরকে ভোগবাদী নফসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কামনা-বাসনা আর প্রেমের ভূত, এগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভোগের মধ্য দিয়ে।
(৪) মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরপরের অধ্যায়গুলো ধারাবাহিকভাবে প্রাপ্তি বিষয়ে কথা বলেছে। দুনিয়াবি পদের লোভ, কিপটামি, পয়সা ওড়ানো, আয়-ব্যয়ের ব্যাখ্যা, মিথ্যা, হিংসা, এভাবে পঞ্চম থেকে দশম অধ্যায় পর্যন্ত আলোচনা করেছেন। মানুষ যখন নিয়ামতের মাঝে ডুবে যায়, কামনা-বাসনা পেয়ে বসে, তখন সে মনে যা চায় তা-ই করে। অর্জিত সম্পদ ধরে রাখতে চায়, আর খায়েশ পূরণে হয় লাগামছাড়া। মিথ্যা আর হিংসার জন্ম এভাবেই।
(৫) আর ওপরের বিষয়গুলো যাদের কাবু করে ফেলে, অহংকার তাদের তুঙ্গে থাকে। আর তাই ৩৭ থেকে ৪৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আক্রোশ, রাগ, মনের অহংবোধ, হামবড়া ভাব তথা আত্মতুষ্টি, লোক-দেখানি কাজকারবারের মতো অসুখগুলোর চিকিৎসা বাতলে দিয়েছেন লেখক।
(৬) ওপরের রোগগুলো ব্যক্তি ভেদে বৈচিত্র্যময়। মাত্রায় কারও কম, কারও-বা বেশি। তা সত্ত্বেও কিছু রোগ থাকে কমন। যেমন অতিরিক্ত চিন্তা, একটুতেই ভেঙ্গে পড়া, দুশ্চিন্তা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, অতিরিক্ত ভয়, মাত্রাতিরিক্ত খুশি, আলসেমি এগুলো আমাদের রন্ধে রন্ধে ঘুরে বেড়ায়। আর মানুষকে যখন এতগুলো অসুখ পেয়ে বসে, তখন সে আর নিজের রোগ শনাক্ত করতে পারে না। তাই ২২ নং অধ্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের টিপস দিয়েছেন লেখক।
(৭) পরিশেষে লেখক পরিবেশ নিয়ে কথা বলেছেন। মানুষ পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। পরিবেশই বলে দেয় একটি বাচ্চার স্বভাব-প্রকৃতি কেমন হবে। আর একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি রেখাপাত তৈরি করে স্ত্রী, সন্তান। তাই বইয়ের শেষের দিকে লেখক আশেপাশের মানুষগুলোর দেখভাল নিয়ে কথা বলেছেন। কীভাবে সন্তানকে শাসন করবেন, আদর্শ স্ত্রী নির্বাচন করবেন, পরিবার থেকে শুরু করে কাজের লোকদের সাথে আপনার ব্যবহার কেমন হবে, মোদ্দাকথা যারা আপনার রূহানী জগতের সাথী হয়ে পাশে থাকবে আমৃত্যু, তাদের চিকিৎসা বাতলে দিয়েছেন।
(৮) এভাবে লেখক আত্মার পরিচর্যার একটি রুটিন সাজিয়ে দিয়েছেন ধরে ধরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আত্মার চিকিৎসা করতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো আসল রোগটার কথাই বেমালুম থেকে যাই। নিখাদ চরিত্র গড়া। তাই বইয়ের শেষে এসে লেখক যেন পাঠকের মনে একটু টোকা দিয়ে গেলেন, তোমার যাত্রা এখানেই শেষ নয়।
.
মোট কথা গোটা বই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাজিয়েছেন লেখক। যা কলেবরে ছোট হলেও প্রজ্ঞায় আর গভীরতায় বড় বড় বইগুলোকে হার মানায়। তাত্ত্বিক কথা ছেড়ে রোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুগুলো যেভাবে চিহ্নিত করেছেন, যেন অন্তরকে হাতে নিয়ে প্রতিটি শিরা-উপশিরা কেউ একজন ব্যাখ্যা করছেন! বইটি পড়ার সময় এমনই মনে হয়েছে আমার। অনুবাদক মাসুদ শরীফ আর সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বইটির যে বাংলা রূপ দিয়েছেন, মাঝপথে ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছি এটি একটি অনূদিত বই!
মন্তব্যঃ
বই কি জীবন পরিবর্তন করতে পারে!!
এই বইটি পারে।
#Read_to_Lead






